Ad Code

আইপিএলে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে শেষ ওভারের রোমাঞ্চ?

 

IPL

২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে আইপিএলের ম্যাচগুলো যেন একেবারে ভিডিও গেমের স্কোরকার্ডে পরিণত হয়েছিল। একদিনেই দুই ম্যাচে মিলিয়ে প্রায় ১০০০ রান! প্রথমে পাঞ্জাব কিংস ২৬৪ রান তাড়া করে জিতে গেল। কয়েক ঘণ্টা পর সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ২২৮ রান তাড়া করে ম্যাচ বের করে নিল। অবাক করার বিষয়, দুই ম্যাচের একটিও শেষ ওভার পর্যন্ত যায়নি।

এর ঠিক পরদিন আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। কলকাতা নাইট রাইডার্স ও লখনউ সুপার জায়ান্টস এমন এক ম্যাচ খেলল যেখানে দুই দলই বারবার জয়ের সুযোগ হারিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন আইপিএলে সুপার ওভার খুবই বিরল ঘটনা। গত পাঁচ বছরে মাত্র তিনটি ম্যাচ সুপার ওভারে গিয়েছে, অথচ একসময় এক মৌসুমেই চারটি সুপার ওভার দেখা গিয়েছিল।

আসলে সুপার ওভার কমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো শেষ ওভারের নাটকীয় ম্যাচ এখন অনেক কম হচ্ছে। আগে যেসব ম্যাচ শেষ ছয় বলে গিয়ে দাঁড়াত, এখন সেগুলোর বেশিরভাগই আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে প্রায় ৪৫ শতাংশ ম্যাচ শেষ ওভার পর্যন্ত উত্তেজনা ধরে রেখেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ২৮.৬ শতাংশে। ২০২৫ সালে ছিল ২৯ শতাংশ, আর ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ শতাংশ।

এর মানে আধুনিক আইপিএলে দলগুলো এখন হয় অনেক সহজে জিতে যাচ্ছে, নয়তো বড় ব্যবধানে হেরে যাচ্ছে। শেষ ওভারের সেই “এক ব্যাটসম্যান বনাম এক বোলার” নাটকীয় পরিস্থিতি কমে গেছে।

এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ২০০ বা তার বেশি রান তাড়া করার ম্যাচগুলোতে। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ২০০-২১৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জিতেছিল মাত্র তিনটি দল। কিন্তু ২০২৩ সালের পর সেই সংখ্যাটা হঠাৎ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২-এ। শুধু তাই নয়, ২২০-এর বেশি রানও এখন নিয়মিত তাড়া করে জিতে যাচ্ছে দলগুলো।

কয়েক দিন আগেই সানরাইজার্স হায়দরাবাদ মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের করা ২৪৩ রান ১৯তম ওভারেই তুলে ফেলে। এটাই ছিল এই মৌসুমে ২০০-এর বেশি রান তাড়া করে জয়ের দশম ঘটনা। পুরো ২০২৫ মৌসুমের রেকর্ডও এর আগেই ভেঙে গেছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, হঠাৎ কী বদলে গেল?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে পাওয়ারপ্লেতে। আধুনিক টি-টোয়েন্টিতে এখন ম্যাচের ভিত গড়ে যায় প্রথম ছয় ওভারেই। আগে ২২০+ রান তাড়া করতে নামা দলগুলো পাওয়ারপ্লেতে গড়ে ৫৮ রান তুলত। এখন সেই সংখ্যা প্রায় ৮০। রানরেটও ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে।

অর্থাৎ দলগুলো এখন শুরু থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা শেষ ওভারের জন্য অপেক্ষা করতে চায় না। আগে ব্যাটসম্যানরা হিসাব করে খেলত, এখন তারা শুরু থেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গতিতে রান তুলতে চায়, যাতে পরে চাপ কম থাকে।

দেবদত্ত পাডিক্কাল সম্প্রতি এ নিয়ে দারুণ একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, এখন দলগুলো শুধু প্রয়োজনীয় রানরেট ধরে রাখতে চায় না, বরং সেটার চেয়ে এগিয়ে থাকতে চায়। কারণ শুরুতেই বাড়তি রান তুলে ফেলতে পারলে পরের দিকে উইকেট পড়লেও সমস্যা কম হয়।

এই মানসিকতা একসময় ছিল না। মহেন্দ্র সিং ধোনির যুগে রান তাড়া করার কৌশল ছিল ভিন্ন। তিনি ম্যাচ শেষ ওভার পর্যন্ত নিয়ে যেতে পছন্দ করতেন। ধোনির অনেক ঐতিহাসিক জয়ের গল্প তৈরি হয়েছে শেষ ওভারে। ২০১৮ সালে বেঙ্গালুরুতে শেষ ওভারে ১৬ রান লাগা অবস্থায় তাঁর শান্ত মাথার ব্যাটিং আজও আইপিএলের ক্লাসিক মুহূর্তগুলোর একটি।

কিন্তু আধুনিক দলগুলো এখন সেই ঝুঁকি নিতে চায় না। ২০২৩ সালে চালু হওয়া “ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার” নিয়ম ব্যাটিংকে আরও গভীর করেছে। এখন দলগুলোর হাতে বাড়তি বিশেষজ্ঞ ব্যাটার থাকে, ফলে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে।

তবে মজার ব্যাপার হলো, ১৮০ থেকে ১৯৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করার ম্যাচগুলোতেই এখন শেষ ওভারের উত্তেজনা বেশি দেখা যায়। কারণ এই স্কোরকে দলগুলো নাগালের মধ্যেই মনে করে। তাই তারা শুরু থেকেই বেপরোয়া হয় না। ফলে ম্যাচ অনেক সময় শেষ ওভার পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

কিন্তু ২২০ বা ২৪০ রানের লক্ষ্য এলে এখনকার দলগুলো অন্য রকম আচরণ করে। শুরুতেই এত দ্রুত রান তোলে যে শেষ ওভারের দরকারই পড়ে না।

সব মিলিয়ে আইপিএলের নাটকীয়তা হারিয়ে যায়নি, শুধু জায়গা বদলেছে। আগে উত্তেজনা থাকত শেষ ওভারে, এখন সেটা চলে এসেছে পাওয়ারপ্লে কিংবা মাঝের ওভারগুলোর আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে। আধুনিক আইপিএল যেন দর্শকদের আর অপেক্ষা করাতে চায় না—এখন ম্যাচের “ক্লাইম্যাক্স” অনেক সময় ১৯তম ওভারেই শেষ হয়ে যায়।

Post a Comment

0 Comments